• বুধবার ( সন্ধ্যা ৭:২৬ )
  • ২১শে ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইং
  • ৪ঠা জমাদিউস-সানি ১৪৩৯ হিজরী
  • ৯ই ফাল্গুন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ ( বসন্তকাল )
MY SOFT IT

বদলে যাওয়া সরকারি বিদ্যালয়

চারপাশে ছাদনিলতার গাঢ় সবুজ ‘প্রাকৃতিক দেয়াল’। ভেতরে বড় খেলার মাঠ সবুজ ঘাসে ঢাকা। চত্বরে ছোট ছোট গাছে রাধাচূড়ার রক্তিম প্রস্ফুটন। আছে কলাবতীসহ নানা ফুল। দেয়ালের ভেতরে সারি করে দাঁড়িয়ে আছে মেহগনি, সেগুনসহ বৃক্ষরাজি। একতলা বিদ্যালয় ভবন ছিমছাম, পরিপাটি। ছোট প্রশাসনিক ভবনটির এক পাশে শৌচাগার, অন্য পাশে আছে বিশুদ্ধকরণ যন্ত্রে খাওয়ার পানির ব্যবস্থা।
এই হচ্ছে আলহাজ ডা. আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বহিরাঙ্গন। ঢাকা বাইপাস সড়কে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের দখিনখান ধীরাশ্রম এলাকায় অবস্থিত বিদ্যালয়টিতে সম্প্রতি গিয়ে দেখা যায়, শ্রেণিকক্ষে পাঠ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পরনে স্কুল ড্রেস, পায়ে কেডস। সবার চোখ সামনের ব্ল্যাকবোর্ডে। গ্রামীণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এলেবেলে ভাব একদম নেই।
বিদ্যালয় ভবনের গায়ে লেখা ইংরেজ লেখক ড্যানিয়েল ডেফোর বাণী, ‘যার অল্প আছে সে দরিদ্র নয়, যে বেশী আশা করে সেই দরিদ্র’। আছে আরও নানাজনের মহৎ উপদেশমূলক বাণী। শ্রেণিকক্ষগুলোর পৃথক নাম আছে; সব কটিই বড় বড় কবির নামে। রয়েছে কম্পিউটার শিক্ষা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা। মোট কথা, বিদ্যালয়ের পুরো পরিবেশটা শিক্ষার আবহে তৈরি করা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল হাই বলেন, ১৯৮১ সালে আলহাজ ডা. আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু। বর্তমান মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের পরিবার বিদ্যালয়ের জন্য জমি দান করে এবং তাঁর বাবার নামে এর নামকরণ করা হয়। ২০১৩ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি হয়।
প্রধান শিক্ষক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ভবনে শিক্ষা কার্যক্রম চলছিল। ছাত্রছাত্রীও ছিল কম। তিনিসহ চারজন শিক্ষক দিয়ে চলছিল বিদ্যালয়টি। কিন্তু স্থানীয় পোশাক কারখানা মার্কওয়্যার লিমিটেড এবং ঢাকার বিএএফ শাহীন কলেজের সাবেক শিক্ষক আবে কাউসার চৌধুরী তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর বদলে যেতে থাকে সবকিছু। প্রথমেই জরাজীর্ণ ভবনটি সংস্কার করা হয়। পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ-সংযোগ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। সব কক্ষে লাগানো হয় ফ্যান।
বিদ্যালয়ের সামনের মাঠটি আর দশটা বিদ্যালয়ের মাঠের মতোই খেলার অনুপযোগী ছিল। সেই মাঠে মাটি ফেলে ঘাস লাগানো হয়। বিদ্যালয়ের চারদিকে তারের জাল দিয়ে নিরাপত্তাপ্রাচীর দেওয়া হয়। সেই প্রাচীরজুড়ে লাগানো হয় ছাদনিলতা।
সকালে সমাবেশ করে শুরু হয় আলহাজ ডা. আনোয়ার আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান l ছবি: প্রথম আলোআবে কাউসার চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয়ের কাছেই মার্কওয়্যার লিমিটেড কারখানা। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুরোধে কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইজাজ আহমেদ বিদ্যালয়টির পাশে দাঁড়ান।
গত তিন বছরে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে এখন ৩০৪। তাদের জন্য সরকারিভাবে শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। শিক্ষার্থীর তুলনায় এই সংখ্যা অনেক কম। এ কারণে মার্কওয়্যার লিমিটেড বিদ্যালয়ে একজন কম্পিউটার শিক্ষকসহ দুজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়। বিদ্যালয়ের পরিবেশ ও শিশুদের দেখভালের জন্য একজন অফিস সহকারী, দুজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন নৈশপ্রহরী নিয়োগ দেওয়া হয়। বিদ্যালয়ে অভিভাবকদের বসার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা হয়। বসানো হয় দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ যন্ত্র।
তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় করিয়ে দিতে চারটি কম্পিউটার দিয়ে চালু করা হয় তথ্যপ্রযুক্তিকেন্দ্র। সপ্তাহে পালা করে সেখানে তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কম্পিউটার শেখান শিক্ষক মতিউর রহমান।
শিক্ষকেরা বলেন, পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বছরে তিনবার সব শিক্ষার্থীকে বাংলা, অঙ্ক ও ইংরেজি বিষয়ের খাতা, পেনসিল ও রাবার দেওয়া হয়। বছরের শুরুতে দেওয়া হয় জুতা-মোজা। এখন বিদ্যালয় থেকে কোনো শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে না এবং সবাই নিয়মিত আসে ও লেখাপড়া করে।
প্রধান শিক্ষক বলেন, গত কয়েক বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা শতভাগ পাস করেছে। তাই অনেক অভিভাবক আশপাশের কিন্ডারগার্টেন স্কুল থেকেও তাঁদের শিশুদের এই সরকারি বিদ্যালয়ে নিয়ে আসছেন।
দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র সাইদুল ইসলামের মা সিমু আক্তারকে পাওয়া গেল বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের কর্নারে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এখানে লেখাপড়া ভালো হয়। খাতা-কলমও কিনতে হয় না। এ ছাড়া স্কুলের পরিবেশ খুব সুন্দর ও নিরাপদ।
বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণি একটু ব্যতিক্রম। এর নামকরণ করা হয়েছে পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের নামে। ক্লাসে কোনো বেঞ্চ নেই। সবাই ফ্লোরে কার্পেটের ওপর বসে আছে। শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার অনেকটা অভিনয় করে বাচ্চাদের পড়াচ্ছে। ক্লাসে রয়েছে শিশুদের কিছু খেলার সামগ্রীও।
অন্য শ্রেণিকক্ষগুলোর নাম রাখা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়ার নামে।
শিক্ষার্থীদের মাঝে খাতা, পেনসিল বিতরণ করছেন আবে কাউসার চৌধুরী l ছবি: প্রথম আলোপরিবর্তনের এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। স্টুডেন্টস কাউন্সিলের (ছাত্র পরিষদ) নির্বাচিত সদস্যরা নানাভাবে এই কাজে যুক্ত আছে। পঞ্চম শ্রেণির সুমাইয়া আক্তার আছে পরিবেশের দায়িত্বে। তার নেতৃত্বে চলে স্কুলে বাগান করা, গাছ লাগানো ও পরিচর্যার কাজ। শিক্ষার্থীরা নিজেদের বাড়ি থেকে চারা এনে বিদ্যালয়ে রোপণ করে। তাকে সহায়তা করেন একজন শিক্ষক।
তৃতীয় শ্রেণির বর্ণা আক্তার রয়েছে পানিসম্পদের দায়িত্বে। শিক্ষার্থীদের বিশুদ্ধ পানি পানের ব্যবস্থাপনা তার কাজ। পানি অপচয় করলে কী করো—এ প্রশ্নের জবাবে বর্ণার উত্তর, ‘তাদের বোঝাই, পানির অপচয় করা ভালো নয়।’
ক্রীড়া ও সংস্কৃতির দায়িত্বে চতুর্থ শ্রেণির শর্মিলী আক্তার। তার নেতৃত্বে বের হয় শিক্ষার্থীদের দেয়ালিকা শুভ নবোদয়। বিদ্যালয়ের খেলাধুলার আয়োজনও হয় শর্মিলী ও তার সঙ্গে যুক্ত শিক্ষকের নেতৃত্বে।
তৃতীয় শ্রেণির সাব্বির হোসেনের কাজ বই ও শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, সংরক্ষণ। অন্যদের মতো তার সঙ্গেও আছেন একজন শিক্ষক।
ঢাকা থেকে সপ্তাহে দুই দিন বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের এই কর্মোদ্যোগ তদারক করেন আবে কাউসার চৌধুরী। বিএএফ শাহীন কলেজ থেকে অবসরের পর নিস্তরঙ্গ সময় কাটছিল তাঁর। এখন শিশুশিক্ষার্থীদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাচ্ছেন। সরকারি এই বিদ্যালয়ের জন্য বেসরকারি অনুদান সমন্বয় করে শিক্ষার পরিবেশ ও মান উন্নয়নই তাঁর লক্ষ্য। শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া, শিক্ষকদের সুবিধা-অসুবিধা, অভিভাবকদের সুখ-দুঃখের ভাগীদার এখন তিনি।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি উপযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে সব বিদ্যালয়ের চিত্রই এই বিদ্যালয়ের মতো পাল্টে যাবে। তিনি বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদেরও এ ধরনের কাজে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

Web design company Bangladesh

পুরাতন খবর

February 2018
SMTWTFS
« Jan  
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
25262728 

Related News

জনপ্রিয় হচ্ছে ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম

ভার্চ্যুয়াল মুদ্রা ইথিরিয়াম জনপ্রিয় হচ্ছে। বিটকয়েনের পরেই রয়েছে এ মুদ্রা। বিটকয়েনের নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই? ...

বিস্তারিত

এ বছরের স্যান্টা ট্র্যাকার আনলো গুগল

বড়দিনের ছুটির দিনগুলোতে স্যান্টা ক্লজের বর্তমান অবস্থান ও গন্তব্যস্থল জানতে শিশুদের সহায়তা করতে এ বছরের ...

বিস্তারিত

তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের নিয়ে সম্মেলন জানুয়ারিতে

অনলাইন পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে দেশে ‘আনলিমিট কনফারেন্স’ র্শীষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ...

বিস্তারিত

‘ধন্যবাদ’ বলল সোফিয়া

বাংলাদেশ নিয়ে একটি ভিডিও বার্তা পাঠিয়েছে রোবট সোফিয়া। ২০ সেকেন্ডের মতো এই ভিডিও বার্তায় বাংলাদেশকে শুভেচ্ছা ...

বিস্তারিত